নৈতিকতার অভাবে সংঘর্ষে জড়াচ্ছে শিক্ষার্থীরা
ড. বি এম সাজ্জাদ হোসাইন
১৯ নভেম্বর ২০২৫, ১০:৪৬ পূর্বাহ্ণ
অনলাইন সংস্করণ

নৈতিকতার অভাবে সংঘর্ষে জড়াচ্ছে শিক্ষার্থীরা

এই খবরটি পড়া হয়েছে: 12 বার

সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রায়ই সংবাদমাধ্যমে দেখা যায় তুচ্ছ বিষয় নিয়ে মারামারি, দলাদলি কিংবা সহিংসতার চিত্র। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো উচ্চ শিক্ষার কেন্দ্রগুলোও এর বাইরে নয়। এসব ঘটনার মূল কারণ অনুসন্ধান করলে দেখা যায়, শিক্ষার্থীদের মধ্যে নৈতিকতার অভাবই অন্যতম প্রধান কারণ। নৈতিকতা হচ্ছে মানবিক গুণাবলির ভিত্তি, যা মানুষকে সঠিক পথে পরিচালিত করে। কিন্তু বর্তমান প্রজন্মের একটি বড় অংশ সেই নৈতিক দিকনির্দেশনা থেকে ক্রমেই বিচ্যুত হচ্ছে।

একসময় শিক্ষা মানে ছিল চরিত্র গঠন ও আদর্শ মানুষ হওয়া। শিক্ষকের প্রতি শ্রদ্ধা, সহপাঠীর প্রতি ভালোবাসা এবং সমাজের প্রতি দায়িত্ববোধ ইত্যাদি শিক্ষার অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু আজ শিক্ষার উদ্দেশ্য অনেকাংশে পরিবর্তিত হয়েছে। প্রতিযোগিতামূলক সমাজে ভালো ফলাফল, উচ্চ পদ ও আর্থিক সাফল্য অর্জনই হয়ে উঠেছে মূল লক্ষ্য। এই প্রবণতা শিক্ষার্থীদের মানসিক ভারসাম্য নষ্ট করছে এবং তাদের মধ্যে সহযোগিতা ও সহনশীলতার পরিবর্তে হিংসা, রাগ, প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও আক্রমণাত্মক মনোভাব জন্ম দিচ্ছে।

পুঁজিবাদী চিন্তাধারার প্রভাবও এখানে অনস্বীকার্য। সমাজে যখন সাফল্যের মানদণ্ড হয়ে দাঁড়ায় অর্থ, ক্ষমতা ও ভোগসুখ, তখন তরুণ প্রজন্মও সেই পথ অনুসরণে আগ্রহী হয়ে পড়ে। ফলে তারা নৈতিকতার চেয়ে লাভ-ক্ষতির হিসাবেই সব কিছু বিচার করতে শেখে। পুঁজিবাদ মানুষের মধ্যে ব্যক্তিস্বার্থকে প্রাধান্য দেয়, যা সামাজিক মূল্যবোধ ও মানবিক চেতনার পরিপন্থী। শিক্ষার্থীরা যখন এই চিন্তাধারায় প্রভাবিত হয়, তখন তাদের মধ্যে সহমর্মিতা ও শ্রদ্ধাবোধের জায়গায় স্বার্থপরতা ও প্রতিহিংসা জায়গা করে নেয়।

এর পাশাপাশি পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলা যায়। অনেক অভিভাবক এখন সন্তানদের নৈতিক শিক্ষার চেয়ে একাডেমিক সফলতাকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। ব্যস্ত জীবনে সন্তানদের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা বা নৈতিক দিকনির্দেশনা দেওয়ার সুযোগ কমে গেছে। অন্যদিকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও নৈতিক শিক্ষার পাঠ এখন অনেকটাই আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ। শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্কও আগের মতো আন্তরিক নয়। ফলে তরুণরা দিকনির্দেশনা হারাচ্ছে এবং নৈতিক মূল্যবোধের অভাবে সহজেই সংঘর্ষ বা সহিংসতার দিকে ঝুঁকছে।

এই বাস্তবতা থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সমাজ সবারই ভূমিকা থাকতে হবে। সম্পর্ক হতে হবে নিবির। শিশু বয়স থেকেই নৈতিক শিক্ষা ও মানবিক মূল্যবোধ গড়ে তুলতে সবার প্রথমে পরিবার এবং তার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠ্যসূচির সঙ্গে সঙ্গে সহশিক্ষামূলক কার্যক্রম, সামাজিক সেবা ও স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজে শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করা যেতে পারে, যাতে তারা সহযোগিতা, সহমর্মিতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার চর্চা করতে শেখে।

অন্যদিকে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ইতিবাচক বার্তা প্রচার করা জরুরি। সহিংসতা নয়, মানবিকতা ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের বার্তা ছড়িয়ে দিতে হবে। নীতিনির্ধারকদেরও ভাবতে হবে আমাদের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা কোন গতিতে কোন পথে ধাবিত হচ্ছে। কেবল পেশাগত যোগ্যতা অর্জনের জন্য নয়, বরং মানুষ হয়ে ওঠার প্রক্রিয়া সংযুক্ত হওয়া জরুরি।

আজকের শিক্ষার্থীরা আগামী দিনে আমাদের দেশ ও জাতির ভবিষ্যৎ। তাই যদি তাদের নৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়, তবে ভবিষ্যৎ সমাজ অন্ধকারাচ্ছন্ন হবে। এখনই সময় নৈতিক শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়া, মানবিকতা ও দায়িত্ববোধকে পুনরুদ্ধার করা। কেবল নৈতিকতার আলোকেই সংঘর্ষের অন্ধকার থেকে শিক্ষার্থীদের ফিরিয়ে আনা সম্ভব।

Facebook Comments Box

Comments

comments

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

‘পাকিস্তান দিবস’ পালন, নিন্দা জানাল এনডিবি

পাম্পে ঢুকলেই লেখা ‘অকটেন নাই’

খাদ্য মূল্যস্ফীতির ‘লাল’ শ্রেণিতে বাংলাদেশ

এবার বাংলাদে‌শিদের জন্য ভিসা স্থগিত করল যুক্তরাষ্ট্র…

প্রসঙ্গ আড়ং; ব্যাগ বয়কট

আ.লীগের ঘুরে দাড়ানোর পথ দীর্ঘ হবে

মবের ছোবলে আক্রান্ত রাস্ট্র এবার মবমুক্ত হোক

জুলাই সনদ নিয়ে কোনো টালবাহানা জনগণ মেনে নেবে না: জামায়াত আমির

সংসদে দেখে দেখে বলা অনুমোদিত না: স্পিকার

‘সংসদে সমাধান না হলে রাজপথে নামবে বিরোধী দল’

১০

বাজেট সংকটে শিক্ষার্থীদের ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ বন্ধ

১১

‘বিএনপি এ দেশে থাকতে পারবে না’

১২

গোয়ালঘরে মিলল দেড় হাজার লিটার পেট্রোল-অকটেন

১৩

জনগণকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে কাজ শুরু: প্রধানমন্ত্রী

১৪

সরকার বহুদলীয় গণতন্ত্র রক্ষায় বদ্ধপরিকর: তথ্যমন্ত্রী

১৫

জিয়া উদ্যানে অন্ধকার ব্যবসা

১৬

ছাত্র-ছাত্রীকে রাস্তায় দাঁড় করিয়ে রাখা যাবে না: শিক্ষামন্ত্রী

১৭

দীর্ঘদিন পর ব্যাচেলর পয়েন্টে ফিরছেন শামীম সরকার

১৮

মির্জা আব্বাসকে দেখতে এভারকেয়ারে প্রধানমন্ত্রী

১৯

ঢাকায় নোয়াখালী জার্নালিস্ট ফোরামের ইফতার ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত

২০